প্রতিবার যখন কোনো শিশুর ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন কিংবা বলাৎকারের খবর দেখি, তখন আমার মনে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খায় আমরা আসলে কাদের জন্য রাষ্ট্র গড়েছি? শিশুদের জন্য, নাকি ক্ষমতাবানদের জন্য?
বাংলাদেশে শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার খবর এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সংবাদমাধ্যম খুললেই দেখা যায় নতুন কোনো শিশু নির্যাতনের ঘটনা, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা, অথবা কোনো প্রভাবশালীর কারণে বিচার বিলম্বের খবর। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এসব খবর আমাদের আর তেমন বিস্মিতও করে না। যেন আমরা ধীরে ধীরে এই নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার বহু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, প্রকাশিত সংখ্যার বাইরেও আরও অসংখ্য শিশু আছে, যাদের গল্প কোনোদিন সংবাদপত্রের পাতায় আসে না। বিশেষ করে ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা আমাদের সমাজে এমন এক নিষিদ্ধ বিষয়, যা নিয়ে পরিবারগুলো পর্যন্ত মুখ খুলতে ভয় পায়। লজ্জা, সামাজিক অপমান, ভয় সব মিলিয়ে অপরাধীরা অনেক সময় নীরবতার আড়ালে থেকে যায়।
আমার উদ্বেগের আরেকটি জায়গা হলো আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশের অধিকাংশ মাদ্রাসা নিশ্চয়ই সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা প্রদান করছে। কিন্তু যখন কোনো মাদ্রাসা, স্কুল, এতিমখানা বা আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, তখন সেটিকে “প্রতিষ্ঠানের সুনাম” রক্ষার প্রশ্ন হিসেবে না দেখে শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখা উচিত। কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয় অপরাধকে আড়াল করার ঢাল হতে পারে না।
অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, শিশু সুরক্ষার কার্যকর নীতি, স্বাধীন তদারকি, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিদর্শনের অভাব অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়। আমি এই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত। কারণ যেখানে জবাবদিহিতা কম, সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ে।
নারীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা আধ্যাত্মিক চিকিৎসার নামে বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তি নারীদের যৌনভাবে শোষণ করেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বা পরিচিত মানুষের হাতেই নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট অপরাধের কোনো নির্দিষ্ট পোশাক, পেশা বা পরিচয় নেই। অপরাধীকে তার পরিচয় দিয়ে নয়, অপরাধ দিয়েই বিচার করতে হবে।
সবচেয়ে বেশি হতাশ হই রাষ্ট্রের ভূমিকা দেখে। প্রতিটি ঘটনার পর আমরা দেখি নিন্দা, প্রতিবাদ, মানববন্ধন, গ্রেপ্তার তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু হারিয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, কেন একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে? কেন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এত দুর্বল? কেন শিশু সুরক্ষাকে এখনও জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে না?
আমার মতে, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারা। প্রতিটি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতি, নিয়মিত স্বাধীন পরিদর্শন, অভিযোগ গ্রহণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অপরাধ ঘটার পর বিচার গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় প্রভাবের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে চলে যায়, তাহলে সেটি আইনের শাসনের পরাজয়। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত অপরাধীদের রক্ষা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। শিশু নির্যাতনের প্রশ্নে কোনো দল, কোনো মতাদর্শ বা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি পক্ষপাত দেখানোর সুযোগ নেই।
আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু কথাটি যদি সত্যিই বিশ্বাস করি, তাহলে শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ যে রাষ্ট্র তার শিশুদের নিরাপদ রাখতে পারে না, সে রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা বড় বড় অবকাঠামো শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে যায়।
আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে কোনো অভিভাবক সন্তানকে স্কুল, মাদ্রাসা বা হোস্টেলে পাঠিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাবেন না। যেখানে ধর্ম, রাজনীতি বা প্রভাবশালী পরিচয় নয় শুধু আইনই হবে শেষ কথা। যেখানে প্রতিটি শিশু নিরাপদে বড় হবে, আর প্রতিটি অপরাধী তার পরিচয় যাই হোক, ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হবে।
নীরবতা কখনো শিশুদের রক্ষা করেনি। এখন সময় সত্য বলার, জবাবদিহিতা দাবি করার এবং শিশুদের নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বানানোর।




