বাকস্বাধীনতা সমাজের প্রাণ। যেখানে মানুষ নির্ভয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, সেখানে অন্যায়, দুর্নীতি ও মিথ্যার বিস্তার তুলনামূলকভাবে কম হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে সমাজ বা রাষ্ট্র বাক স্বাধীনতা দমন করে, সেই সমাজ কখনোই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘদিন উপেক্ষিত বিষয় হলো—সমকামী ও লিঙ্গবৈচিত্র্যসম্পন্ন মানুষদের (LGBTQ+) বাক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা। তারা বাংলাদেশেরই নাগরিক, কিন্তু বাস্তবে তাদের জীবনযাপন, চলাফেরা ও মত প্রকাশ প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশে সমকামীতা এখনো সামাজিকভাবে ট্যাবু। অনেক ক্ষেত্রে আইনি অস্পষ্টতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সামাজিক চাপ তাদের নীরব থাকতে বাধ্য করে। প্রকাশ্যে কথা বলা তো দূরের কথা, অনেকেই নিজের পরিচয় পরিবারের কাছেও গোপন রাখতে বাধ্য হন। এর ফল হিসেবে দেখা দেয় মানসিক চাপ, হতাশা, কর্মজীবনে পিছিয়ে পড়া এবং চরম ক্ষেত্রে আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পরিণতি।
বাকস্বাধীনতা না থাকলে কেবল ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। যখন একটি জনগোষ্ঠী ভয় ও দমননীতির মধ্যে থাকে, তখন তারা তাদের মেধা, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে, বৈষম্যপূর্ণ সমাজে উৎপাদনশীলতা কমে, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ হ্রাস পায় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশে অনেক সমকামী ও লিঙ্গবৈচিত্র্যসম্পন্ন মানুষ নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এর ফলে সৃষ্টি হয় মেধাপাচার (Brain Drain)—যেখানে দেশ হারায় শিক্ষিত, দক্ষ ও সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি বড় ধরনের ক্ষতি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা। যেসব দেশ বৈচিত্র্য ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেখানে শিল্প, সাহিত্য, প্রযুক্তি ও গবেষণায় দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। ভয়ের পরিবেশে কোনো সমাজে নতুন চিন্তা বা উদ্ভাবন বিকশিত হতে পারে না।
এখানে একটি ভুল ধারণা প্রায়ই প্রচলিত—সমকামীদের অধিকার মানে নাকি সমাজ বা ধর্মের বিরুদ্ধে যাওয়া। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। এটি মূলত মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আইনের সমতার প্রশ্ন। একজন নাগরিক হিসেবে কারও ব্যক্তিগত জীবন, পরিচয় ও মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি আধুনিক, উন্নত ও মানবিক রাষ্ট্র হতে চায়, তাহলে তাকে সব নাগরিকের জন্য বাক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে—যেখানে সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরাও নিরাপদ থাকবে। সমকামী ও লিঙ্গবৈচিত্র্যসম্পন্ন মানুষদের দমন করে নয়, বরং তাদের অন্তর্ভুক্ত করেই একটি শক্তিশালী, উৎপাদনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
বাক স্বাধীনতা দমন করে কোনো সমাজ রক্ষা পায় না; বরং সত্য, মানবিকতা ও সহনশীলতার পথেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।
লেখক: আব্দুর রহমান
স্থান: লন্ডন, যুক্তরাজ্য